মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় ঊর্ধ্বমুখী অপরিশোধিত তেলের বাজার
বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, সৌদি আরবে হুথি হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দর পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের ২৩ অক্টোবরের বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেনদেনের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ওই সেশনে দাম সর্বোচ্চ ১১৭.৩৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়ে ১০৩ ডলারের ওপরে ওঠে।
বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভবিষ্যতে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়াচ্ছে বাজারের চাপ
সৌদি আরব ও ইয়েমেনভিত্তিক হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তেল উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় দেশটিকে ঘিরে যেকোনো বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে তেল কেনাবেচা করছেন। ফলে বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
তেলের বাজারে ঊর্ধ্বগতির আরেকটি কারণ হলো জাহাজ চলাচলের ব্যয় বৃদ্ধি। সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে জাহাজকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হলে পরিবহনে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে বিমা ব্যয় বেড়ে গেলে তেল আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
লিবিয়ার কয়েকটি তেলক্ষেত্র থেকে জ্বালানি পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইপলাইনে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবরও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি অন্যান্য উৎপাদন অঞ্চলের পরিস্থিতিও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিমান পরিবহন, নৌপরিবহন, পণ্য উৎপাদন, কৃষি এবং সড়ক পরিবহনের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এসব খাতে ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়।
তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেই সব দেশে তাৎক্ষণিকভাবে পেট্রোল, ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির খুচরা দাম বেড়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি মূল্যনীতি, কর, ভর্তুকি, মজুত এবং আমদানি চুক্তির ওপরও স্থানীয় বাজারের দাম নির্ভর করে।
সামনে কোন দিকে যাবে তেলের বাজার?
বিশ্লেষকদের নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল এবং তেল উৎপাদন ও রপ্তানির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনার দিকে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং সরবরাহে বাস্তব বিঘ্ন দেখা দিলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, উত্তেজনা কমে গেলে ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাজারে দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের দামের এই উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের পরিবর্তনই বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্সের ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এর জ্বালানি বাজার প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।






মন্তব্য