সৈয়দপুর থেকে চট্টগ্রাম—অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক শাখায় কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, তদন্তে তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক | GLOBAL 24
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক শাখায় গত দুই বছরে প্রায় ৬১ কোটি টাকা গায়েব হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন শাখায় অর্থের ঘাটতি, সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা এবং শাখা পর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নীলফামারীর সৈয়দপুর, চট্টগ্রামের লালদীঘি ইস্ট করপোরেট, পাবনার কাশিনাথপুর এবং চাঁদপুরের ছেংগারচর বাজার শাখায় বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য সামনে আসে। তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও তদন্তের অগ্রগতি শাখাভেদে আলাদা। তাই মোট অর্থের পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
সৈয়দপুর শাখায় ৪৩ কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ
অগ্রণী ব্যাংকের সৈয়দপুর শাখায় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলিমুল আল রাজি তমালের বিরুদ্ধে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সহকর্মীদের পরিচয়পত্র ও গোপন সংকেত ব্যবহার করে নিজের এবং কয়েকটি সন্দেহজনক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি হিসাবের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা স্থানান্তরের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের একটি হিসাব এবং অগ্রণী সুপার সেভিংস হিসাবের লেনদেনও রয়েছে। কয়েকটি হিসাবের পরিচয়সংক্রান্ত নথি, স্বাক্ষর ও যোগাযোগের তথ্য নিয়ে অসংগতি পাওয়ার কথা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকলে নিয়মিত নিরীক্ষা ও তদারকির মাধ্যমে তা আগে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি কেন, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি
চট্টগ্রামের লালদীঘি ইস্ট করপোরেট শাখার ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতির ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলাতে গিয়ে ঘাটতি শনাক্ত হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় শাখার ক্যাশ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মো. কামরুল হোসেন ও তাঁর সহযোগী জহুরুল্লাহ তানভীরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর এ ঘটনায় মামলা করেছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভল্টের অর্থের প্রকৃত পরিমাণ আড়াল করতে এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ভেতরে একশ টাকার নোট রাখার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হবে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কাশিনাথপুর ও ছেংগারচরেও অনিয়মের তথ্য
পাবনার কাশিনাথপুর শাখায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১০ কোটি ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৭৮ টাকার হিসাবের গরমিল ধরা পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
অন্যদিকে, চাঁদপুরের ছেংগারচর বাজার শাখায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভল্টে প্রায় ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
একাধিক শাখায় এমন অভিযোগ সামনে আসায় নগদ অর্থ সংরক্ষণ, ভল্টের হিসাব, দৈনিক লেনদেন যাচাই এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন যথাযথভাবে কার্যকর ছিল কি না, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
শুধু অর্থের ঘাটতি নয়, তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রতিদিনের নগদ লেনদেন, ভাউচার, হিসাবের স্থিতি এবং ভল্টে থাকা অর্থের পরিমাণ নিয়মিত যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। বড় অঙ্কের গরমিল দীর্ঘ সময় অশনাক্ত থাকলে তা অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপনা, জোনাল কার্যালয়ের তদারকি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা বিভাগকে সব ঘটনার জন্য দায়ী করা সমীচীন নয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করা, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রাহকের অর্থ উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
একটি ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। বিভিন্ন শাখায় অর্থের ঘাটতি ও আত্মসাতের অভিযোগ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, যাচাই করা তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহকের বৈধ দাবি নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। কোন ঘটনায় কত টাকা চূড়ান্তভাবে আত্মসাৎ হয়েছে, কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং কারা দায়ী—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।





মন্তব্য