ঢাকা: নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে নানা অসংগতি সামনে এসেছে। বইয়ের কাগজ, মুদ্রণের মান, কালি ব্যবহার ও বাঁধাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে ছাপাখানা পরিদর্শনে গিয়ে অসংগতি পেয়েছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে মুদ্রণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিনা মূল্যে বিতরণের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কিছু ছাপাখানায় নির্ধারিত মানের কাগজ ব্যবহার না করা, নিম্নমানের কালি দিয়ে মুদ্রণ এবং বাঁধাইয়ের ত্রুটির মতো সমস্যা দেখা গেছে। এসব অনিয়মের কারণে বইয়ের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বই ছাপায় কী ধরনের অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে?
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাগজের মান বজায় না রাখার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও নির্ধারিত মানের তুলনায় কম জিএসএমের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। জিএসএম হলো প্রতি বর্গমিটার কাগজের ওজন, যা কাগজের মান যাচাইয়ের অন্যতম একটি সূচক।
এ ছাড়া মুদ্রণের সময় নিম্নমানের কালি ব্যবহারের কারণে বইয়ের লেখা ও ছবি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে বইয়ের বাঁধাইয়েও ত্রুটি পাওয়া গেছে। এসব সমস্যা পাঠ্যবইয়ের স্থায়িত্ব ও পাঠযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি পাঠ্যবইয়ে এ ধরনের ত্রুটি থাকলে পড়াশোনায় অসুবিধা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাই বইয়ের মান যাচাই এবং মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির শর্ত অনুসরণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
নিম্নমানের বই নিয়ে ব্যবস্থা
পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিম্নমানের কাগজ ও মুদ্রণের কারণে কিছু বইয়ের ফর্মা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার খবরও এসেছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় রেখে বই ছাপানো, মুদ্রণকাজ তদারকি এবং সময়মতো বই সরবরাহ নিশ্চিত করা এ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন। অভিযোগ পাওয়া আর অনিয়ম চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
সময়মতো বই বিতরণের পাশাপাশি মান নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ
প্রতি বছর নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম। বিপুলসংখ্যক বই ছাপানো ও দেশজুড়ে বিতরণের জন্য মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি, মান যাচাই এবং সরবরাহের সময়সূচি সমন্বয় করতে হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহের চাপ যেন গুণগত মানের সঙ্গে আপসের কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। বইয়ের কাগজ, ছাপার স্পষ্টতা, রঙের মান এবং বাঁধাই পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ বই শনাক্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই দীর্ঘ সময় ব্যবহার উপযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কাগজের মান খারাপ হলে কিংবা ছাপা অস্পষ্ট হলে শিক্ষার্থীদের পড়তে অসুবিধা হতে পারে। এ কারণে মুদ্রণকাজের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে অসংগতি বা অনিয়মের অভিযোগ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ব্যাখ্যা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ধারিত মানের বই পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত পরিদর্শন এবং মানসম্মত বই সরবরাহের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মুদ্রণকাজের ত্রুটি দূর করে নির্ধারিত মান বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া।




মন্তব্য